ATKMB: চার ম্যাচ জয়হীন, মরসুমের মাঝপথেই চাকরি গেল হাবাসের, কে বসলেন সবুজ-মেরুনের হটসিটে?

11

মহানগর ডেস্ক: কলকাতা ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে জয়। সেটাই শেষ। টানা চার ম্যাচ জয়হীন থাকার মূল্য চোকাতে হল স্প্যানিশ হেডস্যারকে। মরসুমের মাঝপথেই দলের প্রধান কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে অব্যহতি দিল এটিকে মোহনবাগান। শনিবার দুপুরে দু’লাইনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ক্লাবের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, “আমাদের প্রধান কোচের পদ থেকে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সহকারী কোচ মানুয়েল কাসালানা অন্তর্বর্তী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন”।

গত বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ৩-৩-এ ম্যাচ অমীমাংসিত রেখে মাঠ ছাড়েন সবুজ-মেরুন ফুটবলাররা। দু-দু’বার এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিততে পারেনি হাবাসের দল। এই ড্রয়ের ফলে টানা চার ম্যাচে জয়হীন রয়েছে এটিকে মোহনবাগান।

গত ১ ডিসেম্বর মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে ১-৫ গোলে হারার পর থেকে এটিকে মোহনবাগান আর জয়ে ফিরতে পারেনি। জামশেদপুরের কাছে ১-২-এ হার, চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে ১-১ ড্র ও বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্র করে। এর পরই হাবাসকে অব্যহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। নতুন কোনও কোচ আসা পর্যন্ত দলের দায়িত্ব সামলাবেন মানুয়েল।

গত ১ এপ্রিল এটিকে মোহনবাগানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, টানা তৃতীয় বছরের জন্য হিরো আইএসএলে কলকাতার দলের দায়িত্বে থাকছেন হাবাস। সব মিলিয়ে কলকাতায় কোচ হিসেবে এটি তাঁর চতুর্থ বছর। ২০১৪-য় প্রথম আইএসএলে চ্যাম্পিয়ন এটিকে-র কোচ ছিলেন বলিভিয়ার জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ হাবাস।

তাঁর প্রশিক্ষণে ২০১৯-এও চ্যাম্পিয়নের খেতাব জেতে এটিকে এফসি। আইএসএল ২০২০-২১ মরশুমে তিনি নবগঠিত এটিকে মোহনবাগানকে ফাইনালে তোলেন। কিন্তু সফল হননি। তবে সারা লিগে তাঁর দল প্রথম চারের মধ্যেই ছিল। তাই আরও এক বছর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তই নিয়েছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

এই মরশুমে দলেও একাধিক পরিবর্তন করা হয়। মুম্বই সিটি এফসি থেকে গোলকিপার অমরিন্দর সিং ও ফরাসি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হুগো বুমৌসকে আনা হয়। ফিনল্যান্ডের ইউরো কাপ দলের সদস্য মিডফিল্ডার জনি কাউকোকেও উড়িয়ে আনা হয়। গতবার হায়দরাবাদ এফসি-র হয়ে খেলা ভারতীয় ফরোয়ার্ড লিস্টন কোলাসোকেও নিয়ে আসা হয় সবুজ-মেরুন শিবিরে। দলবদলে সবচেয়ে এগিয়ে থেকে শক্তিশালী দল গড়ার পরেও দু’টি করে জয়, হার ও ড্রয়ে আট পয়েন্ট নিয়ে ছয় নম্বরে রয়েছে এটিকে মোহনবাগান। গত বার সারা লিগে তারা যেখানে ১৫টি-র বেশি গোল খায়নি, সেখানে ছ’টি ম্যাচেই ১৩টি গোল খেয়েছে তারা। অবশ্য ১৩ গোল দিয়েছেও।

টানা চার ম্যাচ জয়হীন থাকা প্রসঙ্গে হাবাস সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “ব্যাপারটা মোটেই ভাল হচ্ছে না। ক্রমশ নিজেদের সুনাম হারিয়ে ফেলছি আমরা। প্লে অফে খেলতে গেলে এই সুনাম পুণরুদ্ধার করতেই হবে। দলের ফুটবলারদের এটা বুঝতে হবে। আমরা যদি এই জায়গা থেকে বেরোতে না পারি, তা হলে আমাদের প্লে অফে ওঠার সম্ভাবনা থাকবে না”।

হাবাসের দল বাছাই নিয়ে সম্প্রতি সমালোচনা চলছিল ফুটবল মহলে। সুস্থ হয়ে উঠলেও মাইকেল সুসসাইরাজ, প্রবীর দাসকে শুরু থেকে না খেলানো, ডেভিড উইলিয়ামসকে দেরি করে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত অনেকেরই পছন্দ হয়নি।

আইএসএলে যে সমস্ত কোচেরা কাজ করে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এই স্প্যানিশ কোচকে সফলতমও বলা যায়। এখানেই শেষ নয়, বৈচিত্রময় চরিত্র বললেও বিন্দুমাত্র ভুল হয় না বোধহয়। যখন এটিকে এফসি-র কোচ ছিলেন, তখন তাদের দু’বার আইএসএল খেতাব জিতিয়েছেন হাবাস। ২০১৪ ও ২০১৯-২০-তে। ২০১৫-য় তাঁর প্রশিক্ষণে কলকাতার দল সেমিফাইনালে উঠেছিল। গত মরশুমে এটিকে মোহনবাগানকেও তুলেছিলেন ফাইনালে। দেশের এক নম্বর লিগে এমন সাফল্য আর কোনও কোচ পেয়েছেন বলে মনে হয় না।

২০১৯-২০ মরশুমে সাইড ব্যাক হিসেবে খেলতে অভ্যস্ত প্রবীর দাসকে যে ভাবে রাইট উইং ব্যাক হিসেবে খেলিয়ে চমকে দিয়েছিলেন তিনি, তার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। বাঁ দিকের উইং দিয়ে মাইকেল সুসাইরাজ ও ডান দিক দিয়ে প্রবীরকে দিয়ে আক্রমণ তৈরির কৌশলে একের এক ম্যাচে বাজিমাত করেন তিনি।

কিন্তু গত মরশুমে সুসাইরাজ প্রথম ম্যাচেই ছিটকে যাওয়ায় তাঁর এই কৌশল আর কাজে লাগেনি। ফলে প্রবীরের ভূমিকাও অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে যায়। কিন্তু এ বার দু’জনেই সুস্থ হয়ে দলে ফিরলেও সেই জুটিকে আর আগের মতো কাজে লাগানোর চেষ্টা করিনি।

হাবাস একটা কথাই বারবার বলে এসেছেন। দলের রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকা দরকার। অর্থাৎ নিজের ঘর সুরক্ষিত রেখে শত্রুপক্ষের ঘরে আক্রমণ করো, যাতে কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে শত্রুপক্ষ তোমার জালে বল জড়িয়ে চলে যেতে না পারে। কিন্তু এ বার সেই ভারসাম্যই দেখা যায়নি হাবাসের দলে, যা তিনি বারবার স্বীকারও করেছেন।

এপ্রিলে সবুজ-মেরুন শিবিরের নতুন চুক্তি নিয়ে হাবাস বলেন, “আমার ও আমার টেকনিক্যাল স্টাফের ওপর যে ক্লাব আস্থা রেখেছে, এটাই আমার কাছে খুশির খবর। এএফসি কাপের আগে এই খবরটা আমাদের সবাইকে আরও উৎসাহ জোগাবে। মনোবল বাড়াতেও সাহায্য করবে।

এ বারের লিগ শুরুর আগে তিনি মন্তব্য করেন, “যে খেলোয়াড়রা আমার দলে রয়েছে, তাদের কাজে লাগিয়ে তাদের থেকে সেরাটা বার করে নেওয়াই আমার কাজ। সব মরশুমে বা সব ম্যাচে যে আমাদের একই স্টাইলে বা একই পদ্ধতিতে খেলতে হবে, তার কোনও মানে নেই। আমার হাতে যে রকমের খেলোয়াড় রয়েছে, তাদের শক্তি-দুর্বলতা অনুযায়ীই আমাকে কৌশল, পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সুতরাং আগের মরশুমগুলোতে কী হয়েছিল, আমরা কোন পদ্ধতিতে খেলেছিলাম, তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। এ বার অন্য কিছু ভাবতে হতে পারে”

সেই ‘অন্য কিছু’ কী, তা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সবুজ-মেরুন সমর্থকেরা। সারা দেশের ফুটবলপ্রেমীরাও তাঁর নতুন কৌশল ও পরিকল্পনার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু তেমন কিছুই এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি, যা দেখে নতুন বলে মনে হতে পারে। সেই কারণেই বোধহয় অব্যহতি দেওয়া হল তাঁকে।