শেষবেলায় মা’কে বরণ করতে গিয়ে ভেঙে পড়লেন কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রানি মা

38
Nadia
মহালয়ার দিন থেকে নবমী পর্যন্ত হোম কুণ্ড জ্বলে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে: নিজস্ব চিত্র

নিজস্ব প্রতিনিধি, নদিয়া: দেবীপক্ষ শুরু হতেই এখানে জ্বলে ওঠে রাজরাজেশ্বরীর হোমকুণ্ড। মহালয়ার পরে প্রতিপদের দিন থেকেই পুজো শুরু হয় কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই পুজো। আজও সাবেক রীতি মেনে কয়েক কুইন্ট্যাল ঘি, বেল কাঠ সহ নানা উপাচারে শুরু হয় যজ্ঞ। হোমের এই আগুন টানা জ্বলে নবমী শেষের লগ্ন পর্যন্ত। নবমীর নিশিতে গঙ্গাজল, মধু, ঘি, কলা, পানের আহুতি দিয়ে নেভানো হয় হোম।

শোনা যায়, যশোররাজ প্রতাপাদিত্যকে পরাস্ত করার জন্য মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরকে সাহায্য করার জন্য রাজা উপাধি পেয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। বাগান, দীঘি ঘেরা রাজবাড়িতে আজও থমকে আছে ইতিহাস। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত পুজো আজও ধরে রেখেছে ঐতিহ্যের জৌলুস। অথচ দুর্গা নয়, বংশানুক্রমে এই বাড়িতে চল ছিল অন্নপূর্ণা পুজোর। পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের উৎসাহেই শুরু হয় সর্বসাধারণের জন্য দুর্গাপুজো। তাঁর ইচ্ছেতেই কুমোর দুর্গাপ্রতিমাকে রূপ দেন যোদ্ধাবেশী রাজরাজেশ্বরী রূপে। সেই শুরু আড়াইশো বছর পরেও এতটুকু বদলায়নি মায়ের রূপ।

যদিও বাজেটের কাটছাঁটে বদলেছে দেবীর উচ্চতা। রাজরাজেশ্বরী দেবীর গায়ে বর্ম। হাতে অস্ত্র। ঘোটকাকৃতি সিংহের উপর উপবেশন। প্রতিমার পিছন অর্ঘ চন্দ্রাকৃতি চালচিত্রে আঁকা দশমহাবিদ্যা। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির প্রতিমার বৈশিষ্ট্য এর সামনের দু’টো হাত বড়। পিছনের ৮টি হাত ছোট। পুজোর এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় সমস্ত প্রস্তুতি। ঘর থেকে ঠাকুর দালান ঝাড়পোছ, হোমের জন্য পাহাড় প্রমাণ কাঠ জোগাড় থেকে শুরু করে পুজোর সমস্ত আয়োজন সেরে নিয়ে সেজে ওঠে রাজবাড়ি। কৃষ্ণনগরের রানি মায়ের থেকে জানা গেল, উল্টোরথের দিন হয় কাঠামো পুজো। তারপর ষষ্ঠীর দিন বোধন। নাটমন্দিরের পিছনে বোধনের ঘরে হয় প্রাণ প্রতিষ্ঠা। মনে করা হয় ওই বোধন ঘরেই রয়েছে দেবীর প্রাণ। তাই ওই ঘরের দরজা না আটকে খোলা রাখা হয়।

প্রচলিত রয়েছে সন্ধি পুজোয় ধুনোর ধোঁয়ায় যখন ঢেকে যায় দেবীর মুখ। এই রাজবাড়িতে তখন স্বয়ং আর্বিভূতা হন তিনি। হোম কুণ্ডের প্রজ্জ্বলিত শিখাতেও মেলে তাঁর উপস্থিতির সাক্ষ্য। এই পুজোর মহিমা এমনই যে দূরদুরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে রাজবাড়ির টানে। কিন্তু গত বছর থেকে বাধ সেধেছে কোভিড। বন্ধ হয়ে যায় আড়াইশো বছরের প্রাচীন পুজোর সিঁদুর খেলা। একইসঙ্গে সংক্রমণ এড়াতে উৎসবের সেই খোলামেলা উদ্যমে পড়ে বিধি নিষেধের শৃঙ্খল। এখনও সঙ্গ ছাড়েনি করোনা। তবু এই ভাইরাস ভীতিকে সঙ্গী করেই জীবন সচল নিজের পথে।

আদালতের নির্দেশে মেনেই এবছর ফের কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে রয়েছে সিঁদুর খেলার আয়োজন। তবে আগের মতো খোলামেলা নয়। রয়েছে বিধিনিষেধ। রানিমা জানিয়েছেন, ‘কোভিড বিধি মেনেই এবছর সিঁদুরখেলার অনুষ্ঠান হবে। তবে সর্বোচ্চ ১০০ জন অংশ নিতে পারবেন।’ একইসঙ্গে পুজোর কদিন দুপুর একটার সময় ও রাতে ৯-১০টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে রাজবাড়ির গেট।