হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নাদের স্বপ্নপূরণ করতে পারে রাজ্য সরকারই: কোচ সুভাষ সরকার

65

নিজস্ব প্রতিবেদন: জাকার্তায় সদ্যসমাপ্ত এশিয়ান গেমসে পদক জয়ে ইতিহাস তৈরি করেছে ভারত৷ একই সঙ্গে ইতিহাস রচনা করেছেন বাংলার মেয়ে স্বপ্না বর্মন৷ জলপাইগুড়ির কালিয়াগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা স্বপ্না গেমসের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্ট হেপ্টাথেলনে শুধু সোনা জয় করেননি, ৬০০০ পয়েন্ট অতিক্রম করে গড়ছেন নয়া রেকর্ড৷ স্বপ্না যে নজির গড়ছেন, তা স্বপ্না ছাড়া বিশ্বের আর মাত্র চারজনের রয়েছে৷

এশিয়াডে সোনা জিতে ‘সোনার মেয়ে’ স্বপ্না এখন সংবর্ধনার জোয়ারে ভাসছেন৷ কিন্তু সাইতে তাঁকে তিলে তিলে গড়ে তোলার পিছনে যাঁর সবচেয়ে বড় অবদান, সেই সুভাষ সরকার স্বপ্নার সোনা জয়ের রহস্য উন্মোচন করলেন মহানগর২৪x৭-এর ক্যামেরার সামনে৷ পাশাপাশি, স্বপ্নার কোচ জানালেন, রাজ্য সরকার যদি এগিয়ে আসে, তাহলে আরও অনেক স্বপ্না বাংলা থেকে উঠে আসবে৷ দেশকে গর্বিত করবে৷

স্বপ্নার কোচ সুভাষ সরকারের কথায়, ‘বাংলাতে প্রতিভার অভাব নেই৷ শুধু খুঁজে বের করে সঠিক পরিচর্যার প্রয়োজন৷ তাহলে আগামী দিনে আরও অনেক সোনা দেশকে উপহার দিতে পারবে বাংলার প্রতিভারা৷’ এই প্রসঙ্গে তিনি মহানগরকে বলেন, ‘‘সাইকে ধন্যবাদ৷ উঠতি অ্যাথলিটদের থাকা-খাওয়া-ট্রেনিং থেকে শুরু করে সবকিছুই করছে সাই৷ বাংলার খেলাধুলা মানেই তো সাই৷ যার কোনও বিকল্প নেই আমাদের রাজ্যে৷ অন্যান্য অনেক রাজ্য কিন্তু এ ব্যাপারে অনেক সচেতন৷ আমাদের রাজ্য সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে৷ যদি প্রতিভাবান অ্যাথলিটরা চোখের সামনে একটা ‘গোল’ দেখতে পায়, তারা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হবে৷ রাজ্যকে সঠিক পলিশি ঠিক করতে হবে৷ একটা প্রাপ্তি যোগ হওয়াটা খুব জরুরি৷ কিছু সরকারী অনুদান পেলে, ভবিষ্যত নিশ্চিত দেখলে অনেক প্রতিভা উঠে আসবে৷ তাতে আখেরে আমাদেরই লাভ হবে৷’

রাজ্য সরকারের কাছে সুভাষবাবুর আর্জি, ‘গেমসে যাওয়ার আগেই অন্যান্য অনেক রাজ্য আগে থেকে ঘোষণা করে দিয়েছে প্রাইজ মানি৷ সোনা-রূপো-ব্রোঞ্জ জিতলে অ্যাথলিটদের জন্য সরকারী আর্থিক পুরস্কার অপেক্ষা করে থাকবে, এমনটা জানলে প্রতিযোগিতায় তারা নিজেদের উজার করে দেবে৷ কিন্তু আমাদের রাজ্যে সেটা এখনও হয়নি৷ আর এর জন্য সর্বাগ্রে একটা সঠিক পরিকল্পনার প্রয়োজন৷ যেটা করতে পারে একমাত্র রাজ্য সরকারই৷ একটা সিস্টেমে উঠে আসতে হবে৷ একদম গ্রাস রুট লেভেল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ করলে সাফল্য আপনা-আপনি ধরা দেবে৷ অন্যথায় টেবিল টেনিসের মতো অবস্থা হবে৷ শিলিগুড়ির অনেক তারকা টেবিল টেনিস প্লেয়ার অর্থের অভাবে বাংলা ছেড়ে হরিয়ানাতে চলে গেছে৷’

ভবিষ্যত প্রজন্মের অ্যাথলিটদের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে সহযোগিতার আর্জি জানানোর পাশাপাশি মহনগরের প্রতিনিধির কাছে স্বপ্নার সাফল্যের রহস্য উন্মোচনও করেছেন কোচ সুভাষ সরকার৷ তিনি জানান,ষষ্ঠ ইভেন্ট জাভলিনয়ের পর মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল স্বপ্নার সোনা জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ তখন স্বপ্না ৬৩ পয়েন্টে লিড করছিলেন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চিনের কুইম লিং-এর থেকে৷ সুভাষ সরকারের কথায়, ‘ষষ্ঠ রাউন্ডের পর আমি স্বপ্নার সোনা জয়ের ব্যাপার খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম৷ তার আগে পঞ্চম ইভেন্টে হাই জাম্পের পর চায়না প্রতিদ্বন্দ্বী অবশ্য ১৫৫ পয়েন্টে লিড করছিল৷ যেটা বিরাট একটা পার্থক্য৷ তবে আমি জানতাম স্বপ্না জাভলিনে স্ট্রং৷ এবং সেটাই হল৷ চায়না প্রতিদ্বন্দ্বীর ৮০০ মিটারের পয়েন্ট ট্যালি একবার চোখ বুলিয়ে নিই৷ তখনই বুঝে যাই কোনওভাবেই পরাস্ত করতে পারবে না স্বপ্নাকে৷ ওকে ডেকে শুধু বলেছিলাম, টেকনিক্যালি মিস না করলে তোর সোনা নিশ্চিত৷ ও সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে৷ এবং বাকিটা ইতিহাস৷’

সুভাষবাবুর কাছে মহানগরের প্রশ্ন ছিল, স্বপ্নার ‘এক্স ফ্যাক্টর’ কী? উত্তরে স্বপ্নার কোচ বলেন, ‘ওর প্রতিভাকে অন্বেষণ করতে গিয়ে দেখি, স্বপ্নার মধ্যে একটা খুব ভাল বৈশিষ্ট রয়েছে৷ শারীরিক ও মানসিক, দুটো দিকেই স্বপ্না আর পাঁচটা বাচ্চার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে৷ যেটা খুব ইতিবাচক ছিল ওর সাফল্যের জন্য৷ একটা কিলার ইন্সটিন্ট বা খুনে মেজাজ আছে স্বপ্নার মধ্যে, যেটা খুব দুর্লব৷ সকলের মধ্যে থাকে না৷ আমার কাছে আর যারা আছে, তারাও খুব প্রতিভাবান৷ কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে যেগুলো লাগে, সেগুলো একমাত্র স্বপ্নার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলাম৷’

চোট-আঘাত একটা সময়ে স্বপ্নার কেরিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল৷ অনেক চড়াই-উতরাই রয়েছে স্বপ্নার জীবনে৷ অনেক চোট পয়েছে সে৷ কিন্তু প্রতিভাকে আটকে রাখা যায় না৷ বেঙ্গালুরুতে রাহুল দ্রাবিড়ের ‘গো
স্পোর্টস’ নামক সংস্থাটি খুব দায়িত্বের সঙ্গে স্বপ্নাকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে এনেছে৷ খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্বপ্নার পাশে দ্রাড়িরের সংস্থা না দাঁড়ালে আজ এই দিনটা নাও আসতে পারত বলেই মনে করেন কোচ সুভাষ সরকার৷

স্বপ্নার সাফল্য নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘অনন্য সাধারণ প্রতিভা থাকলেও আন্তর্জাতিক আসরে স্বপ্নার কিছু সমস্যাও রয়েছে৷ স্বপ্নার উচ্চতা বেশ কম৷ দৌড়ের গতিও একটু মন্থর৷ কিন্তু এতটাই প্রতিভাবান সে, যা সব প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে৷ তাই তো স্বপ্না আজ সোনার মেয়ে৷’

আগামিদিনে কি স্বপ্নার মতো আরও রসদ মজুত রয়েছে সুভাষবাবুর হাতে? স্বপ্নার কোচ জানালেন, ‘আমার কেরিয়ারে সেরা প্রাপ্তি স্বপ্না৷ আমার হাতে আর মাত্র চার-পাঁচ বছর রয়েছে সাইয়ের কোচিং৷ হয়তো স্বপ্নাকে দিয়ে আমার কোচিং কেরিয়ারও শেষ হবে৷ আরও যারা আছে, তারা জাতীয় স্তরের জন্য নিজেদের তৈরি করেছে৷ কিন্তু এখনই আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরার মতো স্বপ্নার পরবর্তী আমি কাউকে দেখতে পাইনি৷’

দেখে নিন স্বপ্না বর্মন ও কোচ সুভাষ সরকারের সেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার-